রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল | Rui Fish Head with Moong Dal
রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল অন্য ধরণের স্বাদের ডাল, প্রায় সবার ঘরেই ডাল রান্না করা হয়। ডাল আমাদের প্রতিদিনের খাবারের একটি প্রধান পদ। সেই ডালকে একটু অন্যরকম ভাবে খেতে চাইলে মাছের মাথা দিয়ে রান্না করলে দারুণ লাগে। ছোট খাটো ঘরোয়া অনুষ্ঠান, বিয়ে বাড়ি, ঘরে অথিতি আসলে বা বিশেষ কুনো কারণ ছাড়া ও রান্না হয়ে থাকে। মাছের মাথা দিয়ে আরো অনেক সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। কাতলা মাছের মাথা দিয়ে বাঁধাকপি, মুড়িঘণ্ট, কাতলা মাছের মাথা দিয়ে ফরাস ডাল এই রেসিপি গুলো শেয়ার করা আছে বানিয়ে দেখতে পারেন। কাতলা মাছের মাথা দিয়ে করলে ও ভালো লাগবে তবে রুই মাছের মাথা বড় আকারের হলে ভালো হয়। এখানে প্রায় ২ কিলো ওজনের মাছের মাথা নেওয়া হয়েছে।
রুই মাছের মাথা মুগ ডাল ঘরোয়া অনুষ্ঠান বা বিয়ে বাড়ির জন্য রান্না করা হলে তখন অনেক গুলো মাছের মাথা কিনতে হবে। মাছের মাথা কেনার সময় দেখে নিতে হবে তাজা আছে কি না, তাজা না হলে খেতে ভালো লাগবে না। অনেক সময় দেখা যায় একটু বড় মাছের মাথা হলে কাটতে অসুবিধে হয় তবে দোকান থেকে কাটিয়ে আনলে সুবিধে হয়। মাছের মাথাকে ভালোভাবে ভেজে নিয়ে রান্নায় ব্যবহার করলে ভালো লাগবে, হালকা ভাজলে খেতে ভালো লাগবে না।
এই রান্নাটি করতে ব্যাবহার করা হয়েছে আদা বাটা, টমেটো, কাচা লঙ্কা। আদার প্রচুর গুনাগুন আছে, আদা হজমে সাহায্য করে, আদার রসের মধ্যে মধু মিশিয়ে গরম খেলে কাসি কমে যায়, আদার মধ্যে আন্টি ফাংগাল বৈশিষ্ট্য আছে। রান্নায় আদা করা ভালো, আদার নিজস্ব স্বাদ ও গন্ধ আছে তবে পরিমানমত না দিলে তেতো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পিঁয়াজ, রসুন দিয়ে ও করা যায়। পিঁয়াজ, রসুন ছাড়া করলে ও দারুণ লাগে খেতে। বাসন ব্যবহার করা হয়েছে কড়াই, হাতা, খুন্তি, প্রেসার কুকার, বাটি।
রুই মাছের মাথা, মুগ ডাল, টমেটো, আদা বাটা, কাঁচা লঙ্কা, সর্ষের তেল, নুন, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, ঘরে তৈরি গরম মশলা, জিরে, শুকনো লঙ্কা, এলাচ, দাড়চিনি, তেজপাতা। এই উপকরণ গুলির পরিমান নিচে মেনু কার্ডে দেওয়া আছে দেখে নিতে পারেন।
প্রণালী
রান্নার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি কি করতে হব তা বলে দেওয়া হয়েছে।
ধাপ ১ – প্রথমে মুগ ডাল ভেজে গরম জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে আধ ঘণ্টা
মুগ ডাল ভাজার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে ডাল বেশি ভাজা না হয়,নাড়ানো চালিয়ে যেতে হবে যতসময় না পর্যন্ত ডাল ভাজার গন্ধ বেরিয়ে আসছে আর পাঁচ ছয়টি ডাল লাল হওয়া শুরু হচ্ছে। বেশি ভাজলে সিদ্ধ হতে সময় লাগে আর ভালোভাবে গলে না। সবার আগে ডাল হালকা ভেজে গরম জলে ভিজিয়ে রাখলে রান্না করতে কম সময় লাগে।

ধাপ ২ – রুই মাছের মাথাকে ভালোকরে ধুয়ে নুন,হলুদ দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিতে হবে ১৫/২০ মিনিট
রুই মাছের মাথাকে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় মাছের মাথার কানকর মধ্যে কাদা আর পিচ্ছিল ভাব থাকে তখন নুন মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে তারপর ধুয়ে পরিস্কার করতে হবে। মাছের মাথার মধ্যে যদি আসটে গন্ধ থাকে তাহলে লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে নিলে আসটে গন্ধ চলে যায়। নুন, হলুদ মাখিয়ে কিছু সময় না রাখলে মাথার মধ্যে নুন, হলুদ ঢুকবে না।


ধাপ ৩ – একটি প্লেটে হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, গরম মশলা গুড়ো, নুন, কাচা লঙ্কা, টমেটো কুচো, আদা বাটা তৈরি করে রাখতে হবে
রান্না করার আগে রান্নায় যা যা লাগবে যেমন টমেটো কুচো, আদা বাটা, গরম মশলা গুড়ো, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো এগুলো সব তৈরি করে রাখলে রান্নাতে বেশি সময় লাগে না। এখানে ঘরে তৈরি গরম মশলা গুড়ো ব্যবহার করা হয়েছে। একটু বেশি করে গরম মশলা গুড়ো তৈরি করে রেখে দিলে অনেকবার ব্যবহার করা যায়। ছোট এলাচ, লবঙ্গ, দাড়চিনি, ধনে, জিরে, শুকনো লঙ্কা দিয়ে গরম মশলা গুড়ো করা হয়েছে।

ধাপ ৪ – আরেকটি প্লেটে ফোঁড়নের জন্য ২ টো তেজপাতা, ২ টো শুকনো লঙ্কা, ২ টো এলাচ, ১ টুকরো দাড়চিনি, ১ চামচ আস্ত জিরে নিয়ে নিতে হবে
তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, এলাচ, দাড়চিনি, আস্ত জিরে দিয়ে ফোঁড়ন দিলে খুব সুন্দর গন্ধ হয় আর খেতে ও ভালো লাগে। আস্ত মশলা গুলো এক জায়গায় নিয়ে রাখলে সুবিধে হয় আর খেয়াল রাখতে হবে মশলা গুলো যাতে পুড়ে না যায়, মশলা পুড়ে গেলে তরকারির স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

ধাপ ৫ – কড়াইতে তেল দিয়ে মাছের মাথাকে ভালো করে ভেজে নিতে হবে
মাছের মাথা ভাজার সময় তেলকে ভালোভাবে গরম করতে হবে, তেল গরম না হলে ভাজা ভালো মতো হয় না। এখানে মাছের মাথাকে একটু কড়া করে ভাজাতে হবে, হালকা ভাজলে ভালো লাগবে না।
মাছের মাথা ভাজার সময় দেখা যায় মাছের মাথা কড়াইতে লেগে যায় তার কারণ হল কড়াই ভালোভাবে গরম হয় নি। কড়াইতে তেল দেওয়ার আগে কড়াইকে ভালোভাবে গরম করতে হবে কম আচে।



ধাপ ৬ – তারপর একটি প্রেসার কুকার চুলায় বসিয়ে তাতে তেল দিয়ে টমেটো কুচো, আদা বাটা, একটি কাচা লঙ্কা ও অল্প নুন দিয়ে ২/৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে
প্রেসার কুকারে তেল দিয়ে টমেটো কুচো, আদা বাটা, কাচা লঙ্কা দুই থেকে তিন মিনিট নিতে হবে। টমেটো ভাজলে তরকারির স্বাদ বাড়ে, আদা ও অল্প ভাজলে ভালো লাগে।


ধাপ ৭ – ভেজানো মুগ ডাল জল ঝরিয়ে নিয়ে কুকারে দিয়ে আরো ১/২ মিনিট ভেজে নিতে হবে
ভিজিয়ে রাখা মুগ ডাল জল ঝরিয়ে নিতে হবে তারপর প্রেসার কুকার দিয়ে ১ থেকে ২ মিনিট ভেজে নিতে হবে তবে মুগ ডাল, টমেটো, আদা সবকিছু একসঙ্গে কুকারে দিয়ে সিদ্ধ করলে হবে। একটু তেল দিয়ে ভাজা করে দিলে ডালের স্বাদ বাড়ে।


ধাপ ৮ – ভাজা হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, স্বাদমত নুন দিয়ে মিশিয়ে কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে দিয়ে ১ সিটি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে
যে কোন ধরনের তরকারিতে যদি গরম জল ব্যবহার করলে রান্না তাড়াতাড়ি হয় আর ভালো লাগে খেতে। ভেজানো ডাল ও গরম জল ব্যবহারের জন্য ৫ মিনিটের মধ্যেই সিটি দিয়ে দে। হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো ডাল সিদ্ধ করার সময় দিয়ে দিলে মশলার কাচা গন্ধ থাকে না আর ডালের সঙ্গে মিশে যায়।


ধাপ ৯ – একটি সিটি দেওয়ার পর ৫ মিনিট অপেক্ষা করে কুকারের ঢাকনা খুলে তাতে ভেজে রাখা মাছের মাথা দিয়ে ১/২ মিনিট ফুটাতে হবে
ডাল সিদ্ধ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে অনেকগুলো সিটি না দে, এক সিটি বা দুই সিটি এর বেশি সিটি দিলে ডালের মধ্যে পিচ্ছিল ভাব এসে যায় এর খেতে ভালো লাগে না। আবার অনেক সময় ডাল সিদ্ধ হওয়াটা নির্ভর করে কোন ধরনের ডাল তার উপর। ডাল সিদ্ধ হওয়ার পর ভাজা মাছের মাথা দিয়ে ফুটালে ডালের রসটা মাছের মাথার সঙ্গে মিশে যায়।


ধাপ ১০ – তারপর মাছ ভাজার কড়াইতে অল্প তেল দিয়ে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, এলাচ, দাড়চিনি, জিরে ফোঁড়ন ও আরেকটু সামান্য আদা বাটা দিয়ে নেড়ে মুগ ডাল দিয়ে 2 মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে
এই রান্নাটা শুধু জিরে ফোঁড়ন দিয়ে করা যায় কিন্তু তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, এলাচ, দাড়চিনি, আদা দিয়ে ফোঁড়ন দিলে অন্তত সুন্দর গন্ধ হয় ডালের মধ্যে। আদা দিলে লক্ষ রাখতে হবে যাতে আদা পুড়ে না যায়। আদা দিয়ে একটু নেড়ে ডাল ঢেলে দিতে হবে। মাছের মাথাকে খুন্তি দিয়ে ভেঙ্গে দিতে হবে।


ধাপ ১১ – অবশেষে চেরা কাচা লঙ্কা ও গরম মশলা দিয়ে ১ মিনিট ফুটাতে হবে
চেরা কাচা লঙ্কা ও গরম মশলা দিয়ে অল্প সময় ফুটাতে হবে, গরম মশলা দিয়ে বেশি সময় ফুটালে তাজা গন্ধ থাকে না। কাচা লঙ্কা একদম শেষে দিলে দারুণ সুন্দর গন্ধ আর ভালো লাগে খেতে। তৈরি হয়ে গেল রুই মাছ দিয়ে মুগ ডাল।



গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন। অনুষ্ঠান বাড়ি বা অথিতি আসলে এই রকম পদ রান্না করলে দারুণ হবে।
রুই মুগ ডাল
রুই মুগ ডাল পুরোনো দিনের পদ। মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল একটি আমীস ও সুস্বাদু খাবার। প্রতিদিনের ডাল রান্না থেকে একটু আলাদা। অনুষ্ঠান বাড়ি বা ঘরে অথিতি আসলে এটি রান্না করা হয়। রুই মাছের মাথার মধ্যে প্রোটিন ও প্রচুর পুষ্ঠিগুন আছে। ডাল খাওয়া ভালো, ডালের মধ্যে ও প্রোটিন থাকে।
Ingredients
- ১/ রুই মাছের মাথা - ১ টি
- ২/ মুগ ডাল - ১/২ কাপ
- ৩/ টমেটো - ১ টি
- ৪/ আদা বাটা - ১ টেবিল চামচ।
- ৫/ কাচা লঙ্কা - ৬/৭ টি
- ৬/ সর্ষের তেল পরিমানমত
- ৭/ নুন স্বাদমত
- ৮/ হলুদ গুড়ো - ১/২ চামচ
- ৯/ লঙ্কা গুড়ো - ১/৪ চামচ
- ১০/ ঘরে তৈরি গরম মশলা - ১ চামচ
- ১১/ ফোড়নের জন্য - জিরে ১ চামচ, শুকনো লঙ্কা ২ টো, এলাচ ২ টো, দাড়চিনি ১ টুকরো, তেজপাতা ২ টো
Instructions
- প্রথমে মুগ ডাল ভেজে গরম জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে আধ ঘণ্টা
- রুই মাছের মাথাকে ভালোকরে ধুয়ে নুন,হলুদ দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিতে হবে ১৫/২০ মিনিট
- একটি প্লেটে হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, গরম মশলা গুড়ো, নুন, কাচা লঙ্কা, টমেটো কুচো, আদা বাটা তৈরি করে রাখতে হবে
- আরেকটি প্লেটে ফোঁড়নের জন্য ২ টো তেজপাতা, ২ টো শুকনো লঙ্কা, ২ টো এলাচ, ১ টুকরো দাড়চিনি, ১ চামচ আস্ত জিরে নিয়ে নিতে হবে
- কড়াইতে তেল দিয়ে মাছের মাথাকে ভালো করে ভেজে নিতে হবে
- তারপর একটি প্রেসার কুকার চুলায় বসিয়ে তাতে তেল দিয়ে টমেটো কুচো, আদা বাটা, একটি কাচা লঙ্কা ও অল্প নুন দিয়ে ২/৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে
- ভেজানো মুগ ডাল জল ঝরিয়ে নিয়ে কুকারে দিয়ে আরো ১/২ মিনিট ভেজে নিতে হবে
- ভাজা হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, স্বাদমত নুন দিয়ে মিশিয়ে কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে দিয়ে ১ সিটি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে
- একটি সিটি দেওয়ার পর ৫ মিনিট অপেক্ষা করে কুকারের ঢাকনা খুলে তাতে ভেজে রাখা মাছের মাথা দিয়ে ১/২ মিনিট ফুটাতে হবে
- তারপর মাছ ভাজার কড়াইতে অল্প তেল দিয়ে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, এলাচ, দাড়চিনি, জিরে ফোঁড়ন ও আরেকটু সামান্য আদা বাটা দিয়ে নেড়ে মুগ ডাল দিয়ে 2 মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে
- অবশেষে চেরা কাচা লঙ্কা ও গরম মশলা দিয়ে ১ মিনিট ফুটাতে হবে
