মুড়িঘন্ট তৈরি করার সহজ পদ্ধতি | Murighonto Preparation, the Easiest Way
একটি বহু প্রাচীন, সুস্বাদু বাঙালী খাবার। মুড়ি হল মাছের মাথা আর ঘন্ট হল চিড়ে বা গোবিন্দ ভোগ চাল আর অনেক মশলা দিয়ে তৈরি করা হয় ঘন্ট। আগেকার দিনে বিয়ে বাড়িতে একটি পদ মুড়িঘনটের তো থাকবেই। মাথা খেতে অনেকেই ভালোবাসে। ছোটদের মাছের মাথা খাওয়ানো হতো এই বলে যে মাছের মাথা খেলে পড়াশোনা মনে থাকবে আর বুদ্ধি ও বাড়বে। কারুর ঘরে মাছের মাথা খেতে দেওয়া হয় যিনি বড় উনাকে আবার কারুর ঘরে মাছের মাথা নিয়ে বাধে ঝগড়া কে খাবে তা নিয়ে।
মুড়িঘন্ট কখনও আলু দিয়ে, চিড়ে দিয়ে বা চাল দিয়ে বানানো হত তবে যা দিয়ে বানানো হৌক না কেনো এতো সুস্বাদু লাগে খেতে যে ঘন্ট দিয়ে একথালা ভাত খাওয়া যায়। পিয়াজ, রসুন দিয়ে রাননা করলে যে রকম ভালো লাগে তেমনি পিয়াজ, রসুন ছাড়াও ভালো লাগে খেতে। মাথা কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে মাথাটা যেন তাজা হয়। দেড় কিলো, দুই কিলো ওজনের মাছের মাথা হলে ভালো হয়। অনুষ্ঠান বাড়িতে গোবিন্দ ভোগ চাল দিয়ে বানানো হয়। এখানে ঘরের তৈরি গরম মশলা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কেনা গরম মশলা থেকে ঘরের তৈরি গরম মশলা দিলে বেশি ভালো লাগে। মাছের মাথা দিয়ে আরো কিছু সুস্বাদু রেসিপি শেয়ার করা আছে যেমন কাতলা মাছের দিয়ে বাঁধাকপি, রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল, কাতলা মাছের মাথা দিয়ে ফরাস বিচির ডাল দেখে নিতে পারেন।
এই রান্নাতে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে সেসব প্রত্যেকটির নিজস্ব গুনাগুন রয়েছে। কাতলা মাছের মাথার মধ্যে আছে ভালো পরিমানে অমেগা ৩ ফেটি এসিড, প্রোটিন, চোখ ও ব্রেনের জন্য, ডায়বেটিস ও আথরাইটিসের জন্য ও ভালো। পিঁয়াজ হার্টের রোগ, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পিঁয়াজে আছে এন্টি বেকটেরিয়েল বৈশিষ্ট্য। আদার প্রচুর উপকারিতা যেমন আদা হজমে, সর্দি, কাসি, গা ব্যথা কমাতে, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আদার আরও অনেক গুন আছে। রসুন মানব দেহের ইমিয়ুন সিস্টেমকে প্রচারে, ব্লাড প্রেসার কমাতে সাহায্য করে।
কাতলা মাছের মাথা, গোবিন্দ ভোগ চাল, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, পিঁয়াজ কুচি, আলু, পিঁয়াজ বাটা, রসুন বাটা, আদা বাটা, কাচালঙ্কা, তেজপাতা, এলাচ, দাড়চিনি, লবঙ্গ, আস্ত জিরে, নুন, সর্ষের তেল, গরম মশলা (ঘরের তৈরি)। এই উপকরণ গুলির পরিমান নিচে মেনু কার্ডে দেওয়া আছে দেখে নিতে পারেন।
রান্নার পদ্ধতি
প্রথমে গোবিন্দ ভোগ চালকে ভালো করে ধুয়ে ২০ মিনিটের জন্য জল দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। চাল ভিজিয়ে রাখলে সিদ্ধ হতে সময় কম লাগে। ভেজানো চাল রান্না করার সময় জল ঝরিয়ে কিছু সময় রেখে তারপর দিতে হবে।

মেরিনেশন
মাছের মাথাকে কেটে ভালোকরে ধুয়ে পরিস্কার করে করে নিতে হবে। নুন ও হলুদ দিয়ে মাছের মাথাকে মেখে ১৫/২০ মিনিটের জন্য রেখে দিতে হবে। নুন, হলুদ মাখিয়ে অল্প সময়ের জন্য না রেখে যদি মাছের মাথা ভাজা হয় তবে নুন ও হলুদ ভালোভাবে ঢুকে না এরজন্য খেতে ও ভালো লাগবে না। সময়ের কম থাকলে অন্তত ১০ মিনিটের জন্য রাখতে হবে।


সব্জি ও আস্ত মশলা
একটি মধ্যম আকারের আলুকে খোসা ছাড়িয়ে চৌকো করে কেটে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখতে হবে। পিঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে পাতলা করে লম্বা আকারে কেটে রাখতে হবে। আদা, রসুন, পিঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে বেটে রাখতে হবে। কাচালঙ্কাকে ধুয়ে মাঝখানে চিরে রাখতে হবে। তেজপাতা ধুয়ে, দাড়চিনি, এলাচ, লবঙ্গ, জিরে এইসব ফোঁড়নের জন্য গোটা নিয়ে নিতে হবে।

গুড়ো মশলা
একটি প্লেটে পরিমানমত হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, নুন ও গরম মশলা গুড়ো নিয়ে নিতে হবে। তারপর একটি বাটিতে হলুদ, লঙ্কা, জিরে গুড়ো, অল্প নুন ও গরম জল দিয়ে গাঢ়ো মিশ্রণ বানিয়ে রাখতে হবে। আগেকার দিনে মশলা বেটেই রান্না করা হত তখন গুড়ো মশলার চল ছিল না তবে গুড়ো মশলা থেকে বাটা মশলা দিয়ে রান্না করলে স্বাদ হয় বেশি। তাই গুড়ো মশলা গরম জল দিয়ে মিশ্রণ বানিয়ে রাখলে বাটা মশলার মত লাগে।



একটি বাটিতে হলুদ, জিরে, লঙ্কা ও অল্প নুন নিয়ে গরম জল দিয়ে মিশিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ বানিয়ে রাখা হয়েছে
আলু ও মাছের মাথা ভাজা
চুলায় কড়াই বসিয়ে সর্ষের তেল দিয়ে দিতে হবে। মধ্যম আচে তেল গরম হওয়ার পর আর কমিয়ে দিতে হবে। টুকরো করে রাখা আলু গুলো গরম তেলের মধ্যে দিয়ে সামান্য নুন ও হলুদ দিয়ে নেড়ে হালকা করে ভেজে নিতে হবে। আলু ভাজা হয়ে গেলে একটি প্লেটে তুলে রেখে, নুন, হলুদ মাখিয়ে রাখা মাছের মাথাকে কড়া করে ভেজে নিতে হবে।
অনেক সময় দেখা যায় গরম তেলের জলসহ সব্জি দিলে তেল ছিটকে গায়ের উপর পড়ে তবে গরম তেলের সামান্য নুন ও হলুদ দেওয়ার পর সব্জি দিলে আর তেল ছিটকে পড়বে না। সব্জি সবসময় জল ঝরিয়ে ব্যবহার করা ভালো।
মাছের মাথাকে হালকা ভাজলে ভালো লাগবে না তাই মাথার সব দিক ভালোকরে ভাজতে হবে। মাছের মাথা ভাজার পর তুলে রাখতে হবে একটি প্লেটে মধ্যে।



পিঁয়াজ কুচো ও বাটা মশলা ভাজা
কড়াইতে আরো ১ চামচ তেল দিয়ে গরম হওয়ার পর ফোঁড়নের জন্য রাখা তেজপাতা, দাড়চিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও জিরে ফোঁড়ন দিয়ে দিতে হবে। যখন ফোঁড়নের সব গোটা মশলা ফুটতে শুরু করবে আর ফোঁড়ন থেকে একটি সুন্দর গন্ধ বেরিয়ে আসবে তখন পিঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা করার পর পিয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা ও একটি কাচালঙ্কা দিয়ে ২ থেকে ৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে যাতে পিয়াজ, আদা, রসুনের কাচা গন্ধ চলে যায়।


গোবিন্দ ভোগ চাল ও গুড়ো মশলার মিশ্রণ
জল ঝরিয়ে রাখা গোবিন্দ ভোগ চালকে দিয়ে ২/৩ মিনিট ভাজার পর গুড়ো মশলার মিশ্রণ দিয়ে অল্প সময় কষানোর পর এক কাপ গরম জল দিয়ে মধ্যম আঁচে ২ থেকে ৩ মিনিট ভালোকরে কষাতে হবে। যত ভালোভাবে মশলা কষানো হবে খেতে ততই ভালো লাগবে। মশলা কষানোর উপর তরকারির স্বাদ নির্ভর করে।




গুড়ো মশলার মিশ্রণ দিয়ে অল্প সময় কষানোর পর গরম জল দিয়ে ২/৩ মিনিট ভালোকরে কষে নেওয়া হয়েছে
ভেজে রাখা আলু ও মাছের মাথা
আলু ভাজা, মাছের মাথা ভাজা ও আধ কাপ গরম জল দিয়ে ৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে। কষানো হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল দেওয়ার পর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ৫ থেকে ৬ মিনিট মধ্যম আঁচে রাখতে হবে। মধ্যে মধ্যে ঢাকনা সরিয়ে নেড়ে দিতে হবে আর দেখে নিতে হবে চাল ও আলু সিদ্ধ হচ্ছে কি না।



কষানো হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল দিয়ে ৫ থেকে ৬ মিনিট ভালোকরে ফুটিয়ে নেওয়া হয়েছে
গরম মশলা ও চেরা কাচালঙ্কা
নামানোর আগে চেরা কাচা লঙ্কা ও গরম মশলা দিয়ে আরও এক মিনিট ফুটানোর পর নামিয়ে নিতে হবে। কাঁচা লঙ্কা তরকারি নামানোর আগে দিলে দারুণ সুন্দর গন্ধ ও ভালো হয় খেতে।


পরিবেশন করার পদ্ধতি
মুড়িঘন্ট সবসময় গরম সাদা ভাতের সাথেই করা হয়, তবে পোলাও বা রুটির সাথে খেয়ে দেখা যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে যে মুড়িঘন্ট নামানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি পরিবেশন না করা হয় তবে ঢেকে আর একটু ঝোল ঝোল রাখতে হবে। মুড়িঘন্ট নামানোর কিছুক্ষণ পরই সুখিয়ে যায়।

মুড়িঘন্ট
মুড়িঘন্ট একটি বিখ্যাত খাবার বাঙালীদের। এই পদটি যেমন বিয়ে বাড়ি ও ছোট খাটো অনুষ্ঠান বানানো হয় তেমনই প্রত্যেক বাঙালীদের ঘরে বানানো হয়। মুড়িঘন্ট গোবিন্দ ভোগ চাল বা চিরে দিয়ে রান্না করা হয়। যারা মাছের মাথা খেতে ভালোবাসে তারা এইভাবে রান্না করে খেতে পারেন একদম অনুষ্ঠান বাড়ির মত লাগবে। কাতলা মাছের মাথার মধ্যে আছে প্রচুর পরিমাণে অমেগা ৩ ফেটি এসিড, প্রোটিন, চোখ ও ব্রেনের জন্য ভালো, ডায়বেটিস ও আথরাইটিসের জন্য ও ভালো।
Ingredients
- কাতলা মাছের মাথা - ১ টি
- গোবিন্দ ভোগ চাল - ১/৪ কাপ
- হলুদ গুড়ো - ১/২ চামচ
- লঙ্কা গুড়ো - ১/২ চামচ
- জিরে গুড়ো - ১/২ চামচ
- পিঁয়াজ কুচি - ১ টি
- আলু - ১ টি
- পিঁয়াজ বাটা - ১চামচ
- রসুন বাটা - দেড় চামচ
- আদা বাটা - ১চামচ
- কাচালঙ্কা - ৬/৭ টি
- ফোড়নের জন্য - তেজপাতা ২টি, এলাচ ২টি, দাড়চিনি ১টি, লবঙ্গ ২টি, আস্ত জিরে ১/২ চামচ
- নুন - স্বাদমত
- সর্ষের তেল - পরিমানমত
- গরম মশলা (ঘরের তৈরি) - ১/২ চামচ
Instructions
- প্রথমে গোবিন্দ ভোগ চালকে ধুয়ে ভালো জলে ২০ মিনিটের জন্য ভিজিয়ে রাখতে হবে।
- মাছের মাথাকে ভালোকরে ধুয়ে পরিস্কার করে নিতে হবে। তারপর মাছের মাথার মধ্যে নুন ও হলুদ মাখিয়ে রেখে দিতে হবে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য।
- একটি প্লেটে আলু টুকরো করে, পিঁয়াজ কুচো, পিয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, চেরা কাচালঙ্কা, তেজপাতা, দাড়চিনি, এলাচ, লবঙ্গ, জিরে নিয়ে নিতে হবে।
- আরেকটি প্লেটে হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, গরম মশলা গুড়ো ও নুন নিয়ে নিতে হবে।
- একটি বাটিতে হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, পরিমানমত নুন ও অল্প গরম জল দিয়ে গুলে নিতে হবে।
- কড়াইতে সর্ষের তেল দিয়ে গরম হওয়ার পর আলুগুলোকে নুন ও হলুদ দিয়ে হালকা করে ভেজে নিতে হবে।
- নুন হলুদ মাখিয়ে রাখা মাছের মাথাকে একটু কড়া করে ভেজে নিতে হবে।
- আরো এক চামচ তেল দিয়ে ফোড়নের সব মশলা দিয়ে পিঁয়াজ কুচিকে ভেজে নিতে হবে। আদা বাটা, পিঁয়াজ বাটা, রসুন বাটা, একটি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ২/৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে।
- ভিজিয়ে রাখা গোবিন্দ ভোগ চাল জল ঝরিয়ে দিয়ে ২/৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে।
- তারপর গুড়ো মশলার মিশ্রণটি দিয়ে অল্প সময় কষিয়ে আরো এক কাপ গরম জল দিয়ে আরও ২/৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে।
- ভেজে রাখা মাছের মাথা, ভাজা আলু ও আধ কাপ গরম জল দিয়ে ৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে।
- পরিমানমত গরম জল দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ৫/৬ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে।
- নামানোর আগে ৫/৬ টি কাচালঙ্কা ও গরম মশলা দিয়ে আরো ১ মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিতে হবে।
Nutrition Information:
Yield: 4 Serving Size: 140 gramsAmount Per Serving: Calories: 183 kCal
