দারুণ স্বাদের পাবদা মাছের ঝোল ফুলকপি, আলু দিয়ে | Tasty Pabda Fish Curry with Cauliflower and Potato
গরম কালে হালকা পাতলা মাছের ঝোল খেতে ভালো লাগে। আলু, ফুলকপি দিয়ে পাবদা মাছের ঝোল একটি পুরনো দিনের রান্না করার ধরন। এই পদ বেশিরভাগ বাঙালীদের ঘরে তৈরি করা হয়। আমিও এই রেসিপিটি আমাদের ঘরে প্রায়ই তৈরি করি। এই পদ রান্না করলে মাছের সাথে সব্জি ও খাওয়া হয়। পিঁয়াজ, রসুন ছাড়াও এটি দারুণ লাগে খেতে। এই রেসিপিটির পদ্ধতি ও টিপস সহ ধাপে ধাপে বলে দেওয়া হয়েছে। মাছের আরো রেসিপি শেয়ার করা আছে সেগুলি হল পাবদা মাছের ঝাল, কাতলা মাছের ঝোল দেখে নিতে পারেন।
পাবদা মাছের ঝোল তৈরি করার জন্য লাগবে পাবদা মাছ, ফুলকপির ফুল, আলু, টমেটো, আদা বাটা, কাঁচা লঙ্কা, ধনেপাতা কুচি, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, নুন, সর্ষের তেল, কালো জিরে ও গরম জল। এই উপকরণ গুলির পরিমান নিচে মেনু কার্ডে দেওয়া আছে দেখে নিতে পারেন।
প্রণালী:
পাবদা মাছ পরিষ্কার করা, কাটার পদ্ধতি ও সংরক্ষণের টিপস
প্রথমেপাবদা মাছের পেটের নুংরা ফেলে জল দিয়ে ধুয়েপরিস্কার করে নিতে হবে। মাছ ধুয়ার পর টুকরো করে নিতে হবে।
বাজারে এই মাছ সবসময় ছোট আকারের পাওয়া যায় তবে মাঝে মধ্যে বড় আকারের পাওয়া যায়। বড় আকারের পাবদা মাছ তাই কেটে টুকরো করে নিতে হবে। মাছ টুকরো না করলে রান্না করার উল্টে পাল্টে দিতে অসুবিধে হবে।
আমাদের ঘরে একসাথে বেশি পরিমানে মাছ আনা হয় তখন সেই মাছ একটি পাত্রের মধ্যে না রেখে আলাদা আলাদা পাত্রের (প্লাস্টিকের বক্স বা স্টিলের বক্স) মধ্যে রাখলে মাছ ভালো থাকবে। কারণ প্রত্যেক দিন রান্নার জন্য মাছের পাত্রটি বের করতে হয়, আর সব মাছ দুটো তাপমাত্রার মধ্যে রাখতে হয়, এর ফলে মাছের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। তবে কোন ধরনের বক্স না থাকে তাহলে আলাদা আলাদা পলিথিন বেগে মাছ নিয়ে ফ্রিজে রাখতে পারেন।


মাছ মেরিনেড করার পদ্ধতি
তারপর হলুদ গুড়ো, নুন, লেবুর রস ও সর্ষের তেল দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিতে হবে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য।
পাবদা মাছের মধ্যে নুন, হলুদের সাথে সর্ষের তেল দিয়ে মেরিনেড করতে হবে। কারণ এই মাছ ভাজার সময় অনেক তেল ছিটকয় তাই সর্ষের তেল মাছের মধ্যে লাগিয়ে ভাজলে তেল ছিটকবে না।

ফুলকপি কাটা ও ধুয়ার পদ্ধতি
এরপর একটি ফুলকপি থেকে বড় আকারের ৫-৬ টি ফুল নিয়ে নিতে হবে। তারপর ফুলকপির ফুল গুলোকে অর্ধেক করে কেটে ধুয়ে নিতে হবে। ফুলকপির ফুল গুলো গরম জলের মধ্যে ভিজিয়ে নুন মিশিয়ে ৫ মিনিট দেওয়ার পর ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিতে হবে।
ফুলকপির মধ্যে অনেক সময় পোকা থাকে তাই ভাপিয়ে নিলে পোকা গুলো মরে যায় আর ফুলকপি ও ভালোভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে ফুলকপি কেটে গরম জল ও নুন দিয়ে ভিজিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট রাখলে ও পোকা মরে যায়। এভাবেও ফুলকপি জীবাণু মুক্ত করা যায়।

অন্যান্য সব্জি ও আদা, কাঁচালঙ্কা ইত্যাদি ধুয়ে কেটে নিতে হবে
তারপর একটি পাত্রের মধ্যে আলু কেটে ধুয়ে, টমেটো ধুয়ে কেটে, আদা, কাঁচা লঙ্কা থেতো, ধনেপাতা ধুয়ে ও আস্ত কাঁচা লঙ্কা ধুয়ে নিয়ে নিতে হবে।
আদা ও কাঁচা লঙ্কা এখানে থেতো করে ব্যবহার করা হয়েছে এর জায়গায় বাটাও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর আস্ত কাঁচা লঙ্কা ঝাল বুঝে ব্যবহার করতে হবে। কাঁচা লঙ্কার মধ্যে ঝাল বেশি হলে পরিমান কমিয়ে দিতে হবে।

গুড়ো মশলা নিয়ে জল দিয়ে মিশ্রণ বানিয়ে নিতে হবে
একটি ছোট পাত্রের মধ্যে পরিমানমত হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো ও অল্প নুন নিয়ে গরম জল দিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ বানিয়ে নিতে হবে। এভাবে মশলার মিশ্রণ বানিয়ে নিলে এর গঠন বাটা মশলার মত লাগে।


মেরিনেড করা মাছের টুকরো গুলো ভেজে নিতে হবে
এবারে চুলা জ্বালিয়ে কড়াই বসিয়ে গরম হওয়ার পর সর্ষের তেল দিতে হবে। তেল গরম হয়ে গেলে মেরিনেড করে রাখা মাছের টুকরো গুলো দিয়ে ভেজে নিতে হবে। পাবদা মাছ হালকা করে ভাজতে হয় যেহেতু এই মাছ বড় আকারের তাই একটু বেশি ভাজা করতে হবে।


আলু ও ফুলকপির টুকরো ভেজে নিতে হবে
মাছ ভাজা হওয়ার পর ঐ তেলের মধ্যে কেটে ধুয়ে রাখা আলু দিতে হবে। তারপর অল্প নুন দিয়ে হালকা লাল করে আলু ভেজে নিতে হবে।
আলু ভাজার পর কেটে ধুয়ে রাখা ফুলকপির টুকরো গুলোকে অল্প নুন দিয়ে ভেজে নিতে হবে।
ফুলকপি ভাজা করতে সবসময় কম আঁচে করতে হবে। বেশি আঁচে ফুলকপি ভাজা করলে পূড়ে যাবে অথচ ফুলকপির ভিতরের অংশ কাঁচা থেকে যাবে।


মশলার মিশ্রণ দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে
তারপর কড়াইতে সর্ষের তেল দিয়ে গরম হওয়ার পর কালোজিরে ফোঁড়ন দিতে হবে। কালোজিরে ফোঁড়ন গরম হয়ে গেলে মশলার মিশ্রণ ও আদা, কাঁচা লঙ্কা থেতো দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে। কালো জিরের জায়গায় আস্ত জিরে ও ব্যবহার করা যেতে পারে।


টমেটো ও ভেজে রাখা আলু ফুলকপি দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে
মশলা কষানো হয়ে গেলে টমেটোর টুকরো, ভেজে রাখা ফুলকপি, আলু ও সামান্য গরমজল দিয়ে আরো ২ থেকে ৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে। টমেটো বাটা ও ব্যবহার করা যেতে পারে।

পরিমানমত গরম জল ও ভাজা মাছ দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে
ফুলকপি, আলু ও টমেটো দিয়ে কষানো হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল দিয়ে ফুটে উঠার পর ভেজে রাখা মাছ দিয়ে ৪ থেকে ৫ মিনিট ঢাকা দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে।
রান্নায় সবসময় গরম জল ব্যবহার করলে ভালো হয়। গরম জল রান্নাতে ব্যবহার করলে খাবার সুস্বাদু আর সময় কম লাগে।


অবশেষে কাঁচা লঙ্কা ও ধনেপাতা কুচি দিতে হবে
চার থেকে পাঁচ মিনিট ফুটানোর পর চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ধনেপাতা কুচি দিয়ে আরো ১ থেকে ২ মিনিট ফুটিয়ে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। নামানোর আগে কাঁচা লঙ্কা তরকারির মধ্যে দিলে সুন্দর গন্ধ আসে আর খেতে ও ভালো লাগে। তবে লঙ্কার ঝাল বুঝে পরিমান কমিয়ে দিতে হবে।



পরিবেশন করার পদ্ধতি
এই পদটি তৈরি করার পর একটি পাত্রের মধ্যে নিয়ে নিতে হবে।
তারপর একটি প্লেটের মধ্যে গরম সাদা ভাতের সাথে লেবু, কাঁচা লঙ্কা ও একটি পাত্রের মধ্যে মাছের ঝোল দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ফুলকপি ও পাবদা মাছ খেলে কি কি উপকার হয়
ফুলকপির ও পাবদা মাছের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পুষ্ঠিগুন রয়েছে। ফুলকপির মধ্যে আছে ভিটামিন ‘এ’ যা চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। তাই আমাদের ফুলকপি খাওয়া দরকার। এটিতে আছে প্রচুর ফাইবার যা শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ফুলকপিতে রয়েছে ভিটামিন ‘বি’ ‘সি’ ও ‘কে’ যা সর্দি, কাসি, জ্বর ইত্যাদি হওয়া থেকে দূরে রাখে।
পাবদা মাছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্ঠিগুন রয়েছে যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এই মাছে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম। আমাদের শরীরের দাঁত ও হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্যালসিয়াম। দাঁত সুস্থ রাখতে ও সাহায্য করে ক্যালসিয়াম। এই মাছে আরও রয়েছে ফসফরাস ও লৌহ। আমাদের সুস্থ শরীরের জন্য ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
উপসংহার
পাবদা মাছের পাতলা ঝোল সব্জি দিয়ে গরম কলে দারুণ লাগে খেতে। এই একটি পদ দিয়ে পুরো ভাত খাওয়া যায়। আগেকার দিনে বেশিরভাগ বাঙালী ঘরে এভাবেই মাছের ঝোল রান্না করা হত। ঘরে অথিতি আসলে সব্জি দিয়ে মাছের ঝোল বানিয়ে খাওয়াতে পারেন।

Pabda Macher Jhol Aloo Fulkopi Diye
পাবদা মাছের ঝোল সহজ একটি রান্না। ঘরে থাকা মশলা দিয়ে এই পদ তৈরি করা যায়। পাবদা মাছের পাতলা ঝোল সব্জি দিয়ে গরম কলে দারুণ লাগে খেতে। এই একটি পদ দিয়ে পুরো ভাত খাওয়া যায়। আগেকার দিনে বেশিরভাগ বাঙালী ঘরে এভাবেই মাছের ঝোল রান্না করা হত।
Ingredients
- পাবদা মাছ - ২৫০ গ্রাম
- ফুলকপির ফুল - ৫-৬ টি
- আলু - ১ টি
- টমেটো - ১ টি
- আদা বাটা - ১ চামচ
- কাঁচা লঙ্কা - ৪-৫ টি
- ধনেপাতা কুচি - ১ মুঠো
- হলুদ গুড়ো - ১/২ চামচ
- লঙ্কা গুড়ো - ১ চামচ
- জিরে গুড়ো - ১ চামচ
- নুন - স্বাদমত
- সর্ষের তেল - পরিমানমত
- কালো জিরে - ১/২ চামচ
- গরম জল - পরিমানমত
Instructions
- প্রথমে পাবদা মাছের পেটের নুংরা ফেলে জল দিয়ে ধুয়েপরিস্কার করে নিতে হবে। মাছ ধুয়ার পর টুকরো করে নিতে হবে।
- তারপর হলুদ গুড়ো, নুন, লেবুর রস ও সর্ষের তেল দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিতে হবে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য।
- এরপর একটি ফুলকপি থেকে বড় আকারের ৫-৬ টি ফুল নিয়ে নিতে হবে। তারপর ফুলকপির ফুল গুলোকে অর্ধেক করে কেটে ধুয়ে নিতে হবে।
- তারপর একটি পাত্রের মধ্যে আলু কেটে ধুয়ে, টমেটো ধুয়ে কেটে, আদা, কাঁচা লঙ্কা থেতো, ধনেপাতা ধুয়ে ও আস্ত কাঁচা লঙ্কা ধুয়ে নিয়ে নিতে হবে।
- একটি ছোট পাত্রের মধ্যে পরিমানমত হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো ও অল্প নুন নিয়ে গরম জল দিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ বানিয়ে নিতে হবে।
- এবারে চুলা জ্বালিয়ে কড়াই বসিয়ে গরম হওয়ার পর সর্ষের তেল দিতে হবে। তেল গরম হয়ে গেলে মেরিনেড করে রাখা মাছের টুকরো গুলো দিয়ে ভেজে নিতে হবে।
- মাছ ভাজা হওয়ার পর ঐ তেলের মধ্যে কেটে ধুয়ে রাখা আলু দিতে হবে। তারপর অল্প নুন দিয়ে হালকা লাল করে আলু ভেজে নিতে হবে।
- আলু ভাজার পর কেটে ধুয়ে রাখা ফুলকপির টুকরো গুলোকে অল্প নুন দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিতে হবে।
- তারপর কড়াইতে সর্ষের তেল দিয়ে গরম হওয়ার পর কালোজিরে ফোঁড়ন দিতে হবে। কালোজিরে ফোঁড়ন গরম হয়ে গেলে মশলার মিশ্রণ ও আদা, কাঁচা লঙ্কা থেতো দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে।
- মশলা কষানো হয়ে গেলে টমেটোর টুকরো, ভেজে রাখা ফুলকপি, আলু ও সামান্য গরমজল দিয়ে আরো ২ থেকে ৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে।
- ফুলকপি ও আলু কষানো হয়ে গেলে পরিমানমত গরম জল দিয়ে ফুটে উঠার পর ভেজে রাখা মাছ দিয়ে ৪ থেকে ৫ মিনিট ঢাকা দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে।
- চার থেকে পাঁচ মিনিট ফুটানোর পর চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ধনেপাতা কুচি দিয়ে আরো ১ থেকে ২ মিনিট ফুটিয়ে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে।
