ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে গাঁঠিকচু (Taro Root) / Hilsa Fish curry with Taro Root
ইলিশ মাছ আর কচু—দুটোই বাঙালির প্রিয়, আর এ দুটোর সংমিশ্রণে যে রেসিপি তৈরি হয় তা একেবারে চমৎকার!
ইলিশ মাছ দিয়ে কচুর তরকারি গ্রামীণ বাঙালি রান্নার একটি অসাধারণ স্বাদযুক্ত পদ।
বাংলার ঘরে ঘরে রান্নাঘর শুধু স্বাদের উৎস নয়, বরং এক একটি গল্পের খনি। সেই গল্পের পাতায় পাতায় থাকে নদীর মাছ, ক্ষেতের সবজি, আর মা-ঠাকুমার ভালোবাসা মেশানো রান্না।
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর তরকারি ঠিক তেমনই একটি আবেগঘন পদ, যেখানে মাটির গন্ধ মেশে নদীর সুবাসে।
ইলিশ যার তেলে ভাত খেলে মনে হয় উৎসব লেগে গেছে! আর কচু গ্রামবাংলার সহজ, সাদামাটা অথচ গভীর স্বাদের এক সবজি। যখন এই দুইয়ের মিলন ঘটে, তখন তার রন্ধনগন্ধ শুধু পেট নয়, মনও ভরে দেয়।
এই পদটি শুধুমাত্র রান্নার বিষয় নয়, এটি আমাদের শিকড়, আমাদের ঐতিহ্য। দুপুরবেলা, ভাতের থালায় এক টুকরো নরম ইলিশ আর কচুর তরকারি এ যেন বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের স্বাদ।
ইলিশ মাছের আরো রেসিপি শেয়ার করা আছে সেগুলো হল ইলিশ সিদ্ধ, সর্ষে পোস্ত বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ, ইলিশ মাছের ঝোল ঝিঙে, আলু ও জিরে বাটা দিয়ে, ইলিশ ভাপা, ইলিশ পোস্ত, জিরে বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ দেখে বানিয়ে নিতে পারেন।
ইলিশ মাছের মাথা, গাঁঠিকচু, আদা কাঁচালঙ্কা থেতো, টমেটো বাটা, আস্ত কাঁচালঙ্কা, লেবু, হলুদ গুড়ো, লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো, ভাজা মশলা (ধনে + জিরে), নুন, সর্ষের তেল, আস্ত জিরে, শুকনো লঙ্কা, কাঁচা লঙ্কা, তেজপাতা, গরম জল।
প্রণালী:
ইলিশ মাছের মাথা কেটে ধুয়ে নিতে হবে
প্রথমে ইলিশ মাছের মাথা কাটতে হবে। মাছের মাথা কাটার সময় কানকো কেটে নিতে হবে। তারপর মাছের মাথার আরো একটি ভাগ কেটে নিতে হবে। মাছের মাথা কেটে টুকরো করার পর ভালকরে ধুয়ে নিতে হবে। মাছের মাথার সঙ্গে এক টুকরো মাছ নেওয়া হয়েছে, এটা ইচ্ছাকৃত। তারপর ধুয়ে রাখা ইলিশ মাছের মাথার মধ্যে পরিমানমত নুন ও হলুদ গুড়ো দিয়ে মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিতে হবে যাতে মাছের মাথার মধ্যে ভালোকরে মশলা ঢুকে যায়।


গাঁঠিকচু গুলো ধুয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে
গাঁঠিকচু গুলোর ধুলো বালি ধুয়ে নিতে হবে। তারপর একটি কুকারের মধ্যে গাঁঠিকচু নিয়ে এর মধ্যে পরিমানমত জল, লেবুর রস ও নুন দিয়ে ঢাকা বন্ধ করে দিতে হবে। তারপর গ্যাস জ্বালিয়ে প্রেসার কুকার গ্যাসের উপর বসিয়ে দিতে হবে। চুলার আঁচ মধ্যম রেখে এক সিটি দেওয়ার পর গ্যাস বন্ধ করে দিতে হবে।
প্রেসার কুকারের একটি সিটি দেওয়ার ৫ মিনিট পর কুকারের ঢাকনা খুলে গাঁঠিকচু গুলো একটি পাত্রের মধ্যে নিয়ে খোসা ছাড়ানোর পর গাঁঠিকচু গুলো আধ ভাগ করে নিতে হবে।
গাঁঠিকচু সিদ্ধ করার সময় লেবুর রস না থাকলে ভিনিগার ব্যবহার করা যেতে পারে। গাঁঠিকচু গুলো সিদ্ধ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে কচু গুলো যেন বেশি সিদ্ধ না হয়। তাই প্রেসার কুকারে ১ সিটি আসার পর গ্যাস বন্ধ করে দিতে হবে। তারপর কুকারের ভাপ জাওয়ার পর কুকারের ঢাকনা খুলে একটি ছুরি বা চামচ কচুর মধ্যে গেঁথে দেখে নিতে হবে সিদ্ধ হয়েছে কিনা না। এক সিটি দেওয়ার পর যদি কচু সিদ্ধ না হয় তবে আরেকবার গ্যাস জ্বালিয়ে কুকার বসিয়ে সিটি দেওয়াতে হবে।


মেরিনেট করে রাখা মাছের মাথা ভেজে নিতে হবে
গ্যাস জালিয়ে একটি কড়াই বসিয়ে দিতে হবে। কড়াই গরম হওয়ার পর পরিমানমত সর্ষের তেল দিয়ে দিতে হবে। তেল গরম হওয়ার পর সামান্য নুন ছড়িয়ে দিতে হবে। তারপর মেরিনেট করে রাখা মাছের মাথা গরম তেলের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে। মাছের মাথা গরম তেলের মধ্যে ছাড়ার ১ মিনিট পর একটি খুন্তির সাহায্য উল্টে দিতে হবে। তারপর মাছের মাথার টুকরো লাল লাল করে উল্টে পাল্টে ভেজে নিতে হবে।



সিদ্ধ করে রাখা গাঁঠিকচু গুলো ভেজে নিতে হবে
মাছের মাথা ভাজা হওয়ার পর কড়াইয়ের মধ্যে আরো কিছু পরিমান সর্ষের তেল যোগ করতে হবে। তেল গরম হওয়ার পর জিরে, শুকানো লঙ্কা, তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা, আদা কাঁচা লঙ্কা থেতো দিয়ে দিতে হবে। তারপর সিদ্ধ করে রাখা গাঁঠিকচু ফোঁড়নের মধ্যে দেওয়ার পর পরিমানমত হলুদ গুড়ো ও অল্প নুন নেড়ে ৪ থেকে ৫ মিনিট ভেজে নিতে হবে। গাঁঠিকচু ভাজার সময় চুলার আঁচ একদম কম রাখতে হবে।




গাঁঠিকচু গুলো মশলা দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে
গাঁঠিকচু গুলো লাল লাল করে ভাজা করার পর টমেটো বাটা দিয়ে নাড়িয়ে দিয়ে অল্প ভেজে নিতে হবে। তারপর একে একে লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো সামান্য হলুদ, স্বাদমত নুন ও অল্প গরম জল দেওয়ার পর খুন্তির সাহায্যে ভালোকরে মশলার সাথে মিশিয়ে কষাতে হবে। তারপর মশলা যখন শুকিয়ে আসবে আরো অল্প গরম জল দিয়ে আবারও কিছুক্ষণ কষিয়ে নিতে হবে মশলার সাথে।






পরিমানমত গরম জল গাঁঠিকচুর মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে
গাঁঠিকচু গুলো মশলার সাথে কষিয়ে নেওয়ার পর পরিমানমত গরম জল দিয়ে খুন্তির সাহায্যে নেড়ে ফুটিয়ে নিতে হবে। তরকারি ফুটে উঠার পর ভেজে রাখা ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে ভালোকরে মিশিয়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট পর্যন্ত ফুটিয়ে নিতে হবে। এই তরকারি ফুটানোর সময় চুলার আঁচ মধ্যম রাখতে হবে। আর একটু পর পর খুন্তির সাহায্যে নাড়িয়ে দিতে হবে।
যে কোন পদ তৈরি করার সময় গরম জল ব্যবহার করলে সেই পদটির স্বাদ বেড়ে যায় আর রান্নাতে সময় কম লাগে।



অবশেষে ভাজা মশলা যোগ করে নামিয়ে নিতে হবে
গাঁঠিকচুর তরকারি যখন ফুটে ঘন হয়ে আসবে তখন চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ভাজা মশলা দিয়ে আরো ১ থেকে ২ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। তারপর গ্যাস বন্ধ করে একটি পাত্রের মধ্যে গাঠিকচুর তরকারি নিয়ে নিতে হবে। ভাজা মশলা ও চেরা কাঁচা লঙ্কা তরকারি নামানোর সময় দেওয়া হলে এক অপূর্ব সুন্দর গন্ধ আর খেতেও সুস্বাদু হয়


পরিবেশন করার পদ্ধতি
ইলিশ মাছ দিয়ে গাঁঠিকচুর তরকারি তৈরি করার পর একটি পাত্রের মধ্যে নিয়ে রাখতে হবে। তারপর একটি প্লেটের মধ্যে গরম গরম সাদাভাত ও পরিমানমত গাঁঠিকচুর নিয়ে পরিবেশন করুন দারুণ লাগবে খেতে। এই পদটি গরম ভাতের সঙ্গে একেবারে রাজকীয় লাগে। সরষের তেলের ঘ্রাণ, কচুর মসৃণতা আর ইলিশের তেলের স্বাদ একসাথে অনবদ্য।

উপসংহার
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর তরকারি শুধুই একটা রেসিপি নয়, বরং এটি বাঙালির চিরন্তন ঘরোয়া সুখের প্রতিচ্ছবি। এতে নেই বাহুল্য, নেই জটিলতা—আছে শুধু প্রকৃতির স্বাদ, সহজতার সৌন্দর্য, আর রন্ধনশিল্পের এক নিঃশব্দ কবিতা। এই পদ যখন গরম ভাতের পাশে পরিবেশিত হয়, তখন তার প্রতিটি গ্রাসে বোঝা যায়—স্বাদ কেবল উপকরণে নয়, হৃদয়ে থাকে।একটুখানি কাঁচা লঙ্কা, ইলিশের হালকা তেল, আর কচুর নরম ভাব—এ সব কিছু মিলে তৈরি হয় এমন এক রন্ধনযাত্রা, যা শুধু জিভ নয়, স্মৃতিও জয় করে।
Ilish-Macher-Matha-Diye-Gathikachu
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর তরকারি বাঙালির ঘরোয়া রান্নার এক অমূল্য রত্ন। সরল উপকরণ আর অল্প মশলায় তৈরি এই পদটি শুধু স্বাদে নয়, ঘ্রাণে, স্মৃতিতে এবং ঐতিহ্যে ভরপুর। ইলিশ মাছের মাথার ঘন তেল আর রস যখন কচুর নরম গায়ে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় এক গভীর স্বাদের কম্বিনেশন, যা একবার খেলে বারবার মনে পড়ে।
এই পদটির প্রধান আকর্ষণ হলো—ইলিশের মাথা থেকে বের হওয়া বিশেষ ঘ্রাণ এবং কচুর মোলায়েম, ঝরঝরে স্বাদ। সরষের তেলে কষানো এই তরকারিতে আদা, কাঁচা লঙ্কা ইত্যাদি উপাদান খুব সহজভাবে ব্যবহৃত হয়, যাতে ইলিশ ও কচুর নিজস্ব স্বাদ বজায় থাকে।
গ্রামের মাটির গন্ধ, মায়ের হাতে তৈরি দুপুরের খাবার আর একটুখানি ঝাল-মিষ্টি ঘরোয়া পরিবেশ—এই সব মিলিয়ে ইলিশ মাথা দিয়ে কচুর তরকারি শুধু একটি খাবার নয়, বরং এক আবেগ।
Ingredients
- ইলিশ মাছের মাথা - ১ টি
- গাঁঠিকচু - ২৫০ গ্রাম
- আদা কাঁচালঙ্কা থেতো - ১/২
- টমেটো বাটা - ২ চামচ
- আস্ত কাঁচালঙ্কা - ৭ থেকে ৮ টি
- লেবু - ১ টুকরো
- হলুদ গুড়ো - ১/২ চামচ
- লঙ্কা গুড়ো - ১/২ চামচ
- জিরে গুড়ো - ১/২ চামচ
- ভাজা মশলা (ধনে + জিরে) - ১/২ চামচ
- নুন - স্বাদমত
- সর্ষের তেল - পরিমানমত
- আস্ত জিরে - সামান্য
- শুকনো লঙ্কা - ১ টি
- কাঁচা লঙ্কা - ২ টি
- তেজপাতা - ১ টি
- গরম জল - পরিমানমত
Instructions
- প্রথমে ইলিশ মাছের মাথা কেটে ধুয়ে নিতে হবে হবে। তারপর ধুয়ে রাখা মাছের মাথার মধ্যে পরিমানমত নুন ও হলুদ গুড়ো দিয়ে মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিতে হবে।
- গাঁঠিকচু গুলোর ধুলো বালি ধুয়ে নিতে হবে। তারপর একটি কুকারের মধ্যে গাঁঠিকচু নিয়ে এর মধ্যে পরিমানমত জল, লেবুর রস ও নুন দিয়ে ঢাকা বন্ধ করে দিতে হবে। তারপর গ্যাস জ্বালিয়ে প্রেসার কুকার গ্যাসের উপর বসিয়ে দিতে হবে। চুলার আঁচ মধ্যম রেখে এক সিটি দেওয়ার পর গ্যাস বন্ধ করে দিতে হবে।
- প্রেসার কুকারের একটি সিটি দেওয়ার ৫ মিনিট পর কুকারের ঢাকনা খুলে গাঁঠিকচু গুলো একটি পাত্রের মধ্যে নিয়ে খোসা ছাড়ানোর পর গাঁঠিকচু গুলো আধ ভাগ করে নিতে হবে।
- গ্যাস জালিয়ে একটি কড়াই বসিয়ে গরম হওয়ার পর পরিমানমত সর্ষের তেল দিয়ে দিতে হবে। তেল গরম হওয়ার পর সামান্য নুন ছড়িয়ে দিতে হবে। তারপর মেরিনেট করে রাখা মাছের মাথা গরম তেলের মধ্যে দিয়ে উল্টে পাল্টে ভেজে নিতে হবে।
- মাছের মাথা ভাজা হওয়ার পর কড়াইয়ের মধ্যে আরো কিছু পরিমান সর্ষের তেল যোগ করতে হবে। তেল গরম হওয়ার পর জিরে, শুকানো লঙ্কা, তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা, আদা কাঁচা লঙ্কা থেতো দিয়ে দিতে হবে। তারপর সিদ্ধ করে রাখা গাঁঠিকচু ফোঁড়নের মধ্যে দেওয়ার পর পরিমানমত হলুদ গুড়ো ও অল্প নুন নেড়ে ৪ থেকে ৫ মিনিট ভেজে নিতে হবে।
- গাঁঠিকচু গুলো লাল লাল করে ভাজা করার পর টমেটো বাটা দিয়ে নাড়িয়ে দিতে হবে। তারপর একে একে লঙ্কা গুড়ো, জিরে গুড়ো সামান্য হলুদ, স্বাদমত নুন ও অল্প গরম জল দিয়ে কিছুক্ষণ কষিয়ে নিতে হবে মশলার সাথে।
- গাঁঠিকচু গুলো মশলার সাথে কষিয়ে নেওয়ার পর পরিমানমত গরম জল দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হবে। তরকারি ফুটে উঠার পর ভেজে রাখা ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে নেড়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট পর্যন্ত ফুটিয়ে নিতে হবে।
- গাঁঠিকচুর তরকারি যখন ফুটে ঘন হয়ে আসবে তখন চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ভাজা মশলা (ধনে + জিরে) দিয়ে আরো ১ থেকে ২ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। তারপর গ্যাস বন্ধ করে একটি পাত্রের মধ্যে গাঠিকচুর তরকারি নিয়ে নিতে হবে।
Nutrition Information:
Serving Size: 1 ServingAmount Per Serving: Calories: 340- 390
